Showing posts with label রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৬১ - ১৯৪১). Show all posts
Showing posts with label রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৬১ - ১৯৪১). Show all posts

Saturday, May 22, 2010

অনন্ত প্রেম / রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

...
তোমারেই যেন ভালোবাসিয়াছি শত রূপে শতবার
জনমে জনমে যুগে যুগে অনিবার।
চিরকাল ধরে মুগ্ধ হৃদয় গাঁথিয়াছে গীতহার-
কত রূপ ধরে পরেছ গলায়, নিয়েছ সে উপহার
জনমে জনমে যুগে যুগে অনিবার।

যত শুনি সেই অতীত কাহিনী, প্রাচীন প্রেমের ব্যথা,
অতি পুরাতন বিরহমিলন কথা,
অসীম অতীতে চাহিতে চাহিতে দেখা দেয় অবশেষে
কালের তিমির রজনী ভেদিয়া তোমারি মুরতি এসে
চিরস্মৃতিময়ী ধ্রুবতারকার বেশে।

আমরা দুজনে ভাসিয়া এসেছি যুগলপ্রেমের স্রোতে
অনাদি কালের হৃদয় উৎস হতে।
আমরা দুজনে করিয়াছি খেলা কোটি প্রেমিকের মাঝে
বিরহবিধুর নয়নসলিলে, মিলনমধুর লাজে-
পুরাতন প্রেম নিত্যনতুন সাজে।

মনে পড়া / রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

...
মাকে আমার পড়ে না মনে।
শুধু কখন খেলতে গিয়ে হঠাৎ অকারণে
একটা কী সুর গুনগুনিয়ে কানে আমার বাজে,
মায়ের কথা মিলায় যেন আমার খেলার মাঝে।
মা বুঝি গান গাইত আমার দোলনা ঠেলে ঠেলে-
মা গিয়েছে, যেতে যেতে গানটি গেছে ফেলে।

মাকে আমার পড়ে না মনে।
শুধু যখন আশ্বিনেতে ভোরে শিউলিবনে
শিশির-ভেজা হাওয়া বেয়ে ফুলের গন্ধ আসে
তখন কেন মায়ের কথা আমার মনে ভাসে।
কবে বুঝি আনত মা সেই ফুলের সাজি বয়ে-
পূজোর গন্ধ আসে যে তাই মায়ের গন্ধ হয়ে।

মাকে আমার পড়ে না মনে।
শুধু যখন বসি গিয়ে শোবার ঘরের কোণে,
জানলা থেকে তাকাই দূরে নীল আকাশের দিকে-
মনে হয় মা আমার পানে চাইছে অনিমিখে।
কোলের পরে ধরে কবে দেখত আমায় চেয়ে,
সেই চাউনি রেখে গেছে সারা আকাশ ছেয়ে।
...

Monday, May 17, 2010

বীরপুরুষ / রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

...
            মনে করো, যেন বিদেশ ঘুরে
            মাকে নিয়ে যাচ্ছি অনেক দূরে।
তুমি যাচ্ছ পালকিতে মা চ'ড়ে
দরজা দুটো একটুকু ফাঁক ক'রে,
আমি যাচ্ছি রাঙা ঘোড়ার 'পরে
            টগবগিয়ে তোমার পাশে পাশে।
রাস্তা থেকে ঘোড়ার খুরে খুরে
রাঙা ধুলোয় মেঘ উড়িয়ে আসে।

তালগাছ / রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

...
তালগাছ          এক পায়ে দাঁড়িয়ে
                    সব গাছ ছাড়িয়ে
                         উঁকি মারে আকাশে।
মনে সাধ,        কালো মেঘ ফুঁড়ে যায়
                    একেবারে উড়ে যায়;
                         কোথা পাবে পাখা সে ?
তাই তো সে      ঠিক তার মাথাতে
                    গোল গোল পাতাতে
                    ইচ্ছাটি মেলে তার,-
মনে মনে         ভাবে, বুঝি ডানা এই,
                    উড়ে যেতে মানা নেই
                         বাসাখানি ফেলে তার।

মাস্টারবাবু / রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

...
আমি আজ কানাই মাস্টার,
           পোড়ো মোর বেড়াল ছানাটি।
আমি ওকে মারি নে মা বেত,
           মিছিমিছি বসি নিয়ে কাঠি।
রোজ রোজ দেরি করে আসে,
           পড়াতে দেয় না ও তো মন,
ডান পা তুলিয়ে তোলে হাই
           যত আমি বলি, 'শোন্, শোন্'।
দিনরাত খেলা খেলা খেলা,
           লেখা পড়ায় ভারি অবহেলা।
আমি বলি 'চ ছ জ ঝ ঞ',
ও কেবল বলে 'মিয়োঁ' মিয়োঁ'।

Tuesday, November 24, 2009

পুরাতন ভৃত্য / রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

...

ভূতের মতন চেহারা যেমন,   নির্বোধ অতি ঘোর—
যা‐কিছু হারায়, গিন্নি বলেন,   “কেষ্টা বেটাই চোর।”
উঠিতে বসিতে করি বাপান্ত,   শুনেও শোনে না কানে,
যত পায় বেত না পায় বেতন,   তবু না চেতন মানে।
বড়ো প্রয়োজন, ডাকি প্রাণপণ   চীৎকার করি “কেষ্টা”—
যত করি তাড়া নাহি পাই সাড়া,   খুঁজে ফিরি সারা দেশটা।
তিনখানা দিলে একখানা রাখে,   বাকি কোথা নাহি জানে;
একখানা দিলে নিমেষ ফেলিতে   তিনখানা করে আনে।
যেখানে সেখানে দিবসে দুপুরে   নিদ্রাটি আছে সাধা;
মহাকলরবে গালি দেই যবে   “পাজি হতভাগা গাধা”—
দরজার পাশে দাঁড়িয়ে সে হাসে,   দেখে জ্বলে যায় পিত্ত,
তবু মায়া তার ত্যাগ করা ভার— বড়ো পুরাতন ভৃত্য।

স্বপ্ন / রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

...

          দূরে বহুদূরে
     স্বপ্নলোকে উজ্জয়িনীপুরে
খুঁজিতে গেছিনু কবে শিপ্রানদীপারে
মোর পূর্বজনমের প্রথমা প্রিয়ারে।
মুখে তার লোধ্ররেণু, লীলাপদ্ম হাতে,
কর্ণমূলে কুন্দকলি, কুরুবক মাথে,
তনু দেহে রক্তাম্বর নীবিবন্ধে বাঁধা,
চরণে নূপুরখানি বাজে আধা আধা।
          বসন্তের দিনে
ফিরেছিনু বহুদূরে পথ চিনে চিনে।

জুতা-আবিষ্কার / রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

...

কহিলা হবু, ‘শুন গো গোবুরায়,
         কালিকে আমি ভেবেছি সারা রাত্র—
মলিন ধূলা লাগিবে কেন পায়
         ধরণী‐মাঝে চরণ‐ফেলা মাত্র!
তোমরা শুধু বেতন লহ বাঁটি,
         রাজার কাজে কিছুই নাহি দৃষ্টি।
আমার মাটি লাগায় মোরে মাটি,
         রাজ্যে মোর একি এ অনাসৃষ্টি!
               শীঘ্র এর করিবে প্রতিকার,
               নহিলে কারো রক্ষা নাহি আর।’

কণিকা / রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

...

যথার্থ আপন

কুষ্মাণ্ডের মনে মনে বড়ো অভিমান,
বাঁশের মাচাটি তার পুষ্পক বিমান।
ভুলেও মাটির পানে তাকায় না তাই,
চন্দ্রসূর্যতারকারে করে `ভাই ভাই’।
নভশ্চর ব’লে তাঁর মনের বিশ্বাস,
শূন্য-পানে চেয়ে তাই ছাড়ে সে নিশ্বাস।
ভাবে, `শুধু মোটা এই বোঁটাখানা মোরে
বেঁধেছে ধরার সাথে কুটুম্বিতাডোরে;
বোঁটা যদি কাটা পড়ে তখনি পলকে
উড়ে যাব আপনার জ্যোতির্ময় লোকে।’
বোঁটা যবে কাটা গেল, বুঝিল সে খাঁটি—
সূর্য তার কেহ নয়, সবই তার মাটি।

Friday, November 20, 2009

অন্য মা / রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

...
    আমার মা না হয়ে তুমি
            আর কারো মা হলে
    ভাবছ তোমায় চিনতেম না,
            যেতেম না ওই কোলে ?
    মজা আরো হত ভারি,
    দুই জায়গায় থাকত বাড়ি,
    আমি থাকতেম এই গাঁয়েতে,
            তুমি পারের গাঁয়ে।
    এইখানেতেই দিনের বেলা
    যা-কিছু সব হত খেলা
    দিন ফুরোলেই তোমার কাছে
            পেরিয়ে যেতেম নায়ে।
    হঠাৎ এসে পিছন দিকে
    আমি বলতেম, “বল্ দেখি কে ?”
    তুমি ভাবতে, চেনার মতো,
            চিনি নে তো তবু।
    তখন কোলে ঝাঁপিয়ে পড়ে
    আমি বলতেম গলা ধরে-
    “আমায় তোমায় চিনতে হবেই,
            আমি তোমার অবু!”

Friday, November 13, 2009

নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ / রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

...

আজি এ প্রভাতে রবির কর
কেমনে পশিল প্রাণের 'পর,
কেমনে পশিল গুহার আঁধারে প্রভাতপাখির গান!
না জানি কেন রে এতদিন পরে জাগিয়া উঠিল প্রাণ।
জাগিয়া উঠেছে প্রাণ,
ওরে উথলি উঠেছে বারি,
ওরে প্রাণের বাসনা প্রাণের আবেগ রুধিয়া রাখিতে নারি।

Thursday, November 12, 2009

বাঁশি / রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

...
                        কিনু গোয়ালার গলি।
                          দোতলা বাড়ির
                 লোহার-গরাদে-দেওয়া একতলা ঘর
                            পথের ধারেই।
               লোনাধরা দেয়ালেতে মাঝে মাঝে ধসে গেছে বালি,
                     মাঝে মাঝে স্যাঁতাপড়া দাগ।
               মার্কিন থানের মার্কা একখানা ছবি
                         সিদ্ধিদাতা গণেশের
                                   দরজার 'পরে আঁটা।
                     আমি ছাড়া ঘরে থাকে আর একটি জীব
                                এক ভাড়াতেই,
                                       সেটা টিকটিকি।
                               তফাত আমার সঙ্গে এই শুধু,
                                            নেই তার অন্নের অভাব॥

Wednesday, November 11, 2009

হঠাৎ-দেখা / রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

 ...

রেলগাড়ির কামরায় হঠাৎ দেখা ,
ভাবিনি সম্ভব হবে কোনদিন ।।

আগে ওকে বারবার দেখেছি
লাল রঙের শাড়িতে --
দালিম-ফুলের মত রাঙা;
আজ পরেছে কালো রেশমের কাপড়,
আঁচল তুলেছে মাথায়
দোলন-চাঁপার মত চিকন-গৌর মুখখানি ঘিরে ।
মনে হল, কাল রঙের একটা গভীর দূরত্ব
ঘনিয়ে নিয়েছে নিজের চার দিকে ,
যে দূরত্ব সর্ষেক্ষেতের শেষ সীমানায়
শালবনের নীলাঞ্জনে ।
থমকে গেল আমার সমস্ত মনটা :
চেনা লোককে দেখলেম অচেনার গাম্ভীর্যে ।।

পরিচয় / রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

...


একদিন তরীখানা থেমেছিল এই ঘাটে লেগে
বসন্তের নূতন হাওয়ার বেগে,
তোমরা সুধায়েছিলে মোরে ডাকি
'পরিচয় কোনো আছে নাকি,
যাবে কোনখানে'?
আমি শুধু বলেছি,'কে জানে'!
নদীতে লাগিল দোলা,বাধঁনে পড়িল টান,
একা,বসে গাহিলাম যৌবনের বেদনার গান।
সেই গান শুনি
কুসুমিত তরুতলে তরুন-তরুনী
মোর হাতে দিয়া কহিল,'এ আমাদেরই লোক'।
আর কিছু নয়।
সে মোর প্রথম পরিচয়।
সেতারেতে বাঁধিলাম তার,
গাহিলাম আরবার,
'মোর নাম এই'বলে খ্যাত হোক,
আমি তোমাদেরই লোক,
আর কিছু নয়,
এই হোক শেষ পরিচয়।
...

শেষের কবিতা / রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

 ...

কালের যাত্রার ধ্বনি শুনিতে কি পাও?
তারি রথ নিত্যই উধাও
জাগাইছে অন্তরীক্ষে হৃদয়স্পন্দন-
চক্রে পিষ্ট আঁধারের বক্ষ ফাটা তারার ক্রন্দন।
ওগো বন্ধু,
সেই ধাবমান কাল
জড়ায়ে ধরিল মোরে ফেলি তার জাল-
তুলে নিল দ্রুত রথে
দুঃসাহসী ভ্রমনের পথে
তোমা হতে বহু দূরে।
মনে হয় অজস্র মৃত্যুরে
পার হয়ে আসিলাম
আজি নব প্রভাতের শিখরচুড়ায়;
রথের চঞ্চল বেগ হাওয়ায় উড়ায়
আমার পুরানো নাম।
ফিরিবার পথ নাহি;
দুর হতে যদি দেখ চাহি
পারিবে না চিনিতে আমায়।
হে বন্ধু বিদায়।
কোনোদিন কর্মহীন পূর্ণ অবকাশে
বসন-বাতাসে
অতীতের তীর হতে যে রাত্রে বহিবে দীর্ঘশ্বাস,
ঝরা বকুলের কান্না ব্যতিবে আকাশ,
সেই ক্ষনে খুঁজে দেখো, কিছু মোর পিছে রহিল সে
তোমার প্রাণের প্রানে-; বিস্মৃতি প্রদোষে
হয়তো দিবে সে জ্যোতি,
হয়তো ধরিবে কভু নামহারা স্বপ্নের মুরতি।
তবু সে তো স্বপ্ন নয়,
সব চেয়ে সত্য মোর, সেই মৃত্যুঞ্জয়-
সে আমার প্রেম,
তারে আমি রাখিয়া এলেম
অপরিবর্তন অর্ঘ্য তোমার উদ্দেশ্যে।
পরিবর্তনের স্রোতে আমি যাই ভেসে
কালের যাত্রায়।
হে বন্ধু, বিদায়।
তোমার হয় নি কোনো ক্ষতি।
মর্তের মৃত্তিকা মোর, তাই দিয়ে অমৃতমুরতি
যদি সৃষ্টি করে থাক, তাহারি আরতি
হোক তব সন্ধ্যাবেলা-
পুজার সে খেলা
ব্যাঘাত পাবে না মোর প্রত্যহের ম্লানস্পর্শ লেগে;
তৃষার্ত আবেগবেগে
ভ্রষ্ট নাহি হবে তার কোনো ফুল নৈবেদ্যের থালে।
তোমার মানস ভোজে সযত্নে সাজালে
যে ভাবরসের পাত্র বাণীর তৃষায়
তার সাথে দিব না মিশায়ে
যা মোর ধুলির ধন, যা মোর চক্ষের জলে ভিজে।
আজও তুমি নিজে
হয়তো বা করিবে রচন
মোর স্মৃতিটুকু দিয়ে স্বপ্নবিষ্ট তোমার বচন।
ভার তার না রহিবে, না রহিবে দায়।
হে বন্ধু, বিদায়।
মোর লাগি করিয়ো না শোক-
আমার রয়েছে কর্ম, আমার রয়েছে বিশ্বলোক।
মোর পাত্র রিক্ত হয় নাই,
শূন্যের করিব পূর্ণ, এই ব্রত বহিব সদাই।
উৎকন্ঠ আমার লাগি কেহ যদি প্রতীক্ষিয়া থাকে
সেই ধন্য করিবে আমাকে।
শুক্লপক্ষ হতে আনি
রজনীগন্ধার বৃন-খানি
যে পারে সাজাতে
অর্ঘ্যথালা কৃষ্ণপক্ষ রাতে,
যে আমারে দেখিবারে পায়
অসীম ক্ষমায়
ভালোমন্দ মিলায়ে সকলি,
এবার পূজায় তারি আপনারে দিতে চাই বলি।
তোমারে যা দিয়েছিনু তার
পেয়েছে নিঃশেষ অধিকার।
হেথা মোর তিলে তিলে দান,
করুণ মুহুর্তগুলি গন্ডুষ ভরিয়া করে পান
হৃদয় অঞ্জলি হতে মম।
ওমো তুমি নিরুপম,
হে ঐশ্বর্য্যবান,
তোমারে যা দিয়েছিনু সে তোমারি দান;
গ্রহন করেছ যত ঋণী তত করেছ আমায়।
হে বন্ধু বিদায়।
...