Monday, April 26, 2010

একদিন সেও কিনা… / রণদীপম বসু



কখনোই বলে নি সে- ভালোবাসি,
ডুবু ডুবু চোখে জ্যোৎস্নাকে ঘৃণা করে চাঁদেপাওয়া অক্ষরের শুদ্ধতায়
সে কোন্ ইচ্ছের ক্রন্দন শুনেছে সে বহুকাল? কেউ কি জানতো,
জ্যোৎস্নাকে ঘৃণা করে করে জ্যোৎস্নার নীল জলে একদিন ডুব দেবে সে !

না-পাওয়ার যন্ত্রণা পাথর-বন্দী হলে পাওয়ার কষ্টেই ইচ্ছেরা কাঁদে।
হয়তো সে জেনেছিলো- জলের অক্ষর জলে মুছে না কখনো,
জ্যোৎস্নার কষ্টও জ্যোৎস্নারা পারে না ধুয়ে দিতে-

Wednesday, December 30, 2009

। খনার কৃষি ও ফল সংক্রান্ত বচন ।

...

০১.
পূর্ব আষাঢ়ে দক্ষিণা বয়,
সেই বৎসর বন্যা হয়।

০২.
মঙ্গলে ঊষা বুধে পা,
যথা ইচ্ছা তথা যা।

০৩.
পাঁচ রবি মাসে পায়,
ঝরা কিংবা খরায় যায়।

০৪.
বামুন বাদল বান,
দক্ষিণা পেলেই মান।

০৫.
বেঙ ডাকে ঘন ঘন,
শীঘ্র হবে বৃষ্টি জান।

Saturday, December 19, 2009

টাকাগুলো কবে পাবো / শহীদ কাদরী

...

‘The worlds owes me a million dollars’
-Gregory Corso

টাকাগুলো কবে পাবো? সামনের শীতে?
আসন্ন গ্রীস্মে নয়?
তবে আর কবে! বৈশাখের ঝড়ের মতো
বিরূপ বাতাসে ঝরে পড়ছে অঝোরে
মণি মাণিক্যের মতো মূল্যবান চুলগুলো আমার এদিকে-
ওদিকে! এখনই মনি-অর্ডার না যদি পাঠাও হে সময়,
হে কাল, হে শিল্প,
তবে
কবে? আর কবে?
যখন পড়বে দাঁত, নড়বে দেহের ভিৎ ?

Sunday, November 29, 2009

ভূমিজ / মাহবুব লীলেন

...

বৃক্ষের কোনো মূল্য নেব না আমি

ঘরবাড়ি মাটি ঘটিবাটি স্বপ্ন সবকিছু নিলামে ওঠাও
তবু বৃক্ষের জন্য কোনো চাইব না দাম

আদিবাসী মানুষের মতো মাটি কামড়ে পড়ে থাক বৃক্ষ সকল
বৃক্ষের প্রযত্নেই আমি ঠিকানা বলব উদ্বাস্তু দিনে;
                    ওই যে। ওই যে গাছ দেখা যায় ওখানে আমার বাড়ি
                    আমার ভাইয়েরা এখনো ওখানে থাকে

ওই মাটির দাবিতে আমি ফিরে এসে ডাক দেবো বৃক্ষকে আবার;
                    আমি এসেছিরে ভাই
                    আমিও তোর মতো এ বাড়ির লোক

বৃক্ষরা থাক- বৃক্ষেরা বড়ো হোক এ মাটির কোলে
মাটি বেচে দিলেও বৃক্ষের মালিকানা রইলো আমার
...
২০০১.০৩.০৯

লিয়েন / মাহবুব লীলেন

...

পুষ্পিতা ফিরে এসে আবার ফিরে গেলে থেকে যায় বহু কামড়ের দাগ
মনের মেঝেতে পড়ে থাকে পড়ে-ফেলা পাঠ্য বইয়ের বিবর্ণ পাতা

এ জীবনে পুষ্পিতা ফিরবেন না আর

সমস্ত সূত্র যাচাই করে সব দায় তিনি শেষ করে গেছেন
বিদ্যালয় থেকে ভালবাসার সমস্ত ক্লাশ তুলে নিতে নিতে বলে গেছেন তিনি
ভালবাসা তোমার জন্য নয়। ভালবাসার মতো করে তৈরি করা হয়নি তোমাকে বাবুই
তুমি বন্ধুত্বের পাঠ নিয়ে পড়াশোনা করো;
অসুস্থ হলে তোমার জন্য ডাক্তার ডেকে দেবো আমি
মাঝে মাঝে সংবাদ নেব। বিশেষ দিনে তোমার জন্যও কিছু উপহার কিনব
                                                    আর...
তুমি ভালো থেকো। কষ্ট নিও না মনে

রিফরমেশন / মাহবুব লীলেন

...

আখতারুজ্জামান ইলিয়াস নাকি মাঝে মাঝে কেটে ফেলা পায়েও চুলকানি অনুভব করতেন
আর চুলকাতে গিয়ে দেখতেন ওখানে পা নেই; কাঠের এক ডামি

হয়তোবা কেটে ফেলা পায়ে পুরনো কোনো মশার কামড় মনে হয়ে যেত তার; তিনি হাত
বাড়াতেন
এবং দেখতেন তার একটা পা নেই

আমাদেরও অন্তরে বহুকিছু ডামি করে নিয়েছি আমরা সৌন্দর্য ও সভ্যতার নামে
বহুকিছু ফেলা হযে গেছে ছেঁটে; বহু অঙ্গ বিকি হয়ে গেছে ভাত আর ভর্তার দামে
কিন্তু কোথাও আমাদের কোনো কামড়ের স্মৃতি নেই। কোন অবচেতন পিঁপড়াও আমাদের
মনে করিয়ে দেয় না আমরা কেউই এখন আর না আছি না পূর্ণ মানুষ- না সম্পূর্ণ বাঙাল

কেননা ইলিয়াসের পায়ে ছিল কাঠ; আর আমাদের হৃৎপিণ্ডে প্লাস্টিক- হৃদয়ে সিমেন্ট
...
২০০৫.০৮.২৩

কলঘরে যাওয়ার আগে / সিকদার আমিনুল হক

...

কলঘরে যাওয়ার আগে তুমি নিয়েছিলে তিরিশ মিনিট। একটা
একটা কবিতা লেখার সমবয়স্ক সময় তিরিশ মিনিটটাকে তুমি
ইলাস্টিকের মতো টানছো। ওদিকে আমি দেখছি কত সাবান
ফেনা হয়ে গলে গলে নরম আর বর্তুল ঘর্মাক্ত শরীর থেকে।

পরিচিতার গোসলের শব্দ ততো ভালো লাগে না। নিজেকে
মনে হয় বাইরে থাকা বকলেশ-বদ্ধ কুকুর; একজনের ইচ্ছার
কাছে বন্দী। কিন্তু যদি পরস্ত্রী হয়, ফর্সা গোলগাল স্বপ্নে দেখা
বউটা হয় পাশের বাড়ির। কিংবা ক্লাস নাইনে পড়া বেণী
ঝোলানো চড়ুইগন্ধ পনেরো বছরের পলা হতো...
মনে পড়ে জামা কাপড় নেই। ইয়ার্ডলি সাবান আর ঝুপঝুপ
করা মগ থেকে পানি পড়ার বিরক্তিকর শব্দ হতো, তাহলে ?...

ভালোবাসা মানে বিচ্ছিন্নতা / ত্রিদিব দস্তিদার

...

অর্থহীন তোমার খেদ-উক্তি সব জ্বালিয়ে দিল
আমার যা-কিছু বলার এবং লেখার উচ্চারণ
এখন ছাই হয়ে বাতাসে ভাসে
আর আমিও ভাসি শূন্যতার ভস্মিত অংশে
হঠাৎ কখনো যদি বৃষ্টি নামে
মাটিতে হয়তো পলি বাড়বে
তোমার মনেও আবার নতুন অঙ্কুর
সবুজ পাতারা দুলবে
হয়তো স্মৃতি-উলকির বাতাস
না-বলা কথা শুনতে চাইবে, না-লেখা কবিতার শব্দ
একতরফা চাপিয়ে দেয়া অভিযোগের ঘানি
গুনে গুনে রাত বাড়বে
পুনরাবৃত্তি হবে সকাল
হয়তো তোমার রোদ হবে কিছুটা উদ্বিগ্ন, কিছুটা ম্লান
এবং প্রশ্ন তুলবে অভিযোগ নিয়ে
তবে সকল অভিযোগই হবে উত্তরহীন, সময়-খ্যাত
এই বলে বিচ্ছিন্ন হবে সম্পর্ক এবং সময়
তারপর আবারও গতি অন্য এক পথ, চলমান।

আসলে ভালোবাসা সম্পর্কের চলমানতা
সময় সংহারে কখনো পথ হয় একা
ভালোবাসা মানে বিচ্ছিন্নতার জন্য তৈরি থাকা।
...

শেষ মুহূর্তের কবিতা / রেজাউদ্দিন স্টালিন

...

শেষ মুহূর্তে মিথ্যে লিখবো
আমার মৃত্যুর জন্য কেউ দায়ী নয়
প্রকৃতপক্ষে আমার মৃত্যুর জন্য তুমিই দায়ী

অসম্ভব ঘন কাঁচের ভেতর থেকে তোমাকে দেখতে
পাত্র ভর্তি পারদের ভেতর থেকে বিরল স্পর্শ করতে
স্বপ্নের ভেতরে একসাথে আকাশে-আকাশে শঙ্খচিল হতে

পৃথিবীর জন্যে একটা মৃত্যু তেমন কিছু নয়
কিন্তু মানুষের জন্যে একটা মৃত্যু সাংঘাতিক শূন্যতা
ঘাসের চোখ থেকে শিশির শুকিয়ে যাওয়ার মতো
সুর সৃষ্টিতে পরাজিত মার্সিয়াসের শরীর থেকে
চামড়া ছাড়িয়ে নেয়ার মতো
পেগাসাস পঙ্খীরাজের পেছনে একটা ডাসকে
লেলিয়ে দেয়ার মতো

বোঝাপড়া / মাহবুব লীলেন

...

ভালোবাসি বলেই তোকে এত দুঃখ দেই প্রতিদিন

আবেগের খোলস ভেঙ্গে সাংসারিক দাবি ও অধিকারে তোর কাছে যাই
ছেড়ে চলে আসি
     ফেলে চলে আসি

নেই প্রত্যাশা- নেই অভিমান
নেই জীবনে জীবন জড়ানো স্বপ্নের জাল
তবু কী অদ্ভুত জড়িয়ে থাকা; বৃক্ষ ও মাটিতে বটের লতানো শেকড়

ভালোবাসি বলেই ভালো না বেসেও কেটে যায বহুদিন
ভালবাসি বলেই ভালবাসার কথাটাই বলা হয় না তোকে
...
১৯৯৯.০৯.০৫

বন্দনাপর্ব / মাহবুব লীলেন

...

জুলিয়েট সে নয়
বারান্দায় দাঁড়ানোর বয়স তার নেই
সে থাকে ঘরে

কলায় বিশ্বস্ত আর কামে নিরাপদ ত্রিশোর্ধ্ব নারী সে
পেশাদারি কুশলে নাড়াতে জানে প্রেমে ও খেলায়
ঠিক ঠিক জানে সে কোনখানে চেপে দিলে বুক
দারুণ শীতে আমি আর উঠব না কেঁপে
কোনখানে ছুঁয়ে দিলে হাত আমিও ছড়াব আগুনের ফুল

সে কুমারী নয়
শরীরের ভয়ে স্বমেহনের অসহ্য দায় তার নেই
শরীরকে জানে সে সংসার ও স্বপ্নের মাপে
মন আর দেহ দিয়ে টেনে
মাটির গভীর থেকে সুখ তুলে এনে
সে জানে
ত্রিশোর্ধ্ব বয়সকে বেঁধে রাখতে শাড়ির সুতায়
...
২০০২.০২.১৫

মন্বন্তর / মাহবুব লীলেন

...

এই দুর্দান্ত বৃষ্টির দিনে কোথায় পুষ্পিতা তুমি
আমাকে বাদ দিয়ে কি তোমার শহরেও বৃষ্টি হয়
তুমি কি তাকে অনুমতি দাও তোমার শরীরে পড়ার

এই বেহায়া বৃষ্টির দিনে কাকে শোনাও তুমি বৃষ্টির সুর-
                     কাকে দেখাও ভেজা আগুনের ভাঁজ
বৃষ্টির কসম কেটে কাকে আজ তুমি নিজের শহরে ডাকো

আমি জানি আমি আর নই সে মানুষ এখন
তুমি কি এখন অন্য কারো রক্ত খাও পুষ্পিতা ?
...

ভুল প্রেমে কেটে গেছে তিরিশ বসন্ত / তসলিমা নাসরিন

...

ভুল প্রেমে কেটে গেছে তিরিশ বসন্ত, তবু
এখনো কেমন যেন হৃদয় টাটায়-
প্রতারক পুরুষেরা এখনো আঙুল ছুঁলে
পাথর শরীর বয়ে ঝরনার জল ঝরে।

এখনো কেমন যেন কল কল শব্দ শুনি
নির্জন বৈশাখে, মাঘ-চৈত্রে-
ভুল প্রেমে কেটে গেছে তিরিশ বসন্ত, তবু
বিশ্বাসের রোদে পুড়ে নিজেকে অঙ্গার করি।

প্রতারক পুরুষেরা একবার ডাকলেই
ভুলে যাই পেছনের সজল ভৈরবী
ভুলে যাই মেঘলা আকাশ, না-ফুরানো দীর্ঘ রাত।
একবার ডাকলেই
সব ভুলে পা বাড়াই নতুন ভুলের দিকে
একবার ভালোবাসলেই
সব ভুলে কেঁদে উঠি অমল বালিকা।

ভুল প্রেমে তিরিশ বছর গেল
সহস্র বছর যাবে আরো,
তবু বোধ হবে না নির্বোধ বালিকার।
...

গোলাপ ফোটাবো / হুমায়ুন আজাদ

...

ওষ্ঠ বাড়িয়ে দাও গোলাপ ফোটাবো,
বঙ্কিম গ্রীবা মেলো ঝরনা ছোটাবো।
যুগল পাহাড়ে পাবো অমৃতের স্বাদ,
জ্ব'লে যাবে দুই ঠোঁটে একজোড়া চাঁদ।
সুন্দরীর নৌকো ঢুকাবো বঙ্গোপসাগরে,
অতলে ডুববো উত্তাল আশ্বিনের ঝড়ে।
শিউলির বোঁটা থেকে চুষে নেবো রস,
এখনো আমার প্রিয় আঠারো বয়স।
তোমার পুষ্পের কলি মধুমদগন্ধময়,
সেখানে বিন্দু বিন্দু জমে আমার হৃদয়।
...

কদম ফুলের ইতিবৃত্ত / আল মাহমুদ

...

আমি তোমাকে কতবার বলেছি আমি বৃক্ষের মতো অনড় নই
তুমি যতবার ফিরে এসেছ ততবারই ভেবেছ
আমি কদমবৃক্ষ হয়ে ঠাঁয় দাঁড়িয়ে থাকব
কিন্তু এখন দেখ আমি গাছের নিচে দাঁড়িয়ে থাকলেও
হয়ে গিয়েছি বৃক্ষের অধিক এক কম্পমান সত্তা
বাঁশি বাজিয়ে ফুঁ ধরেছি আর চতুর্দিক থেকে কেঁদে
উঠেছে রাধারা
আমি কি বলেছিলাম ঘর ভেঙে আমার কাছে এসো
আমি কি বলেছিলাম যমুনায় কলস ভাসিয়ে
         সিক্ত অঙ্গে কদমতলায় মিলিত হও ?
আমি তো বলিনি লাজ লজ্জা সংসার সম্পর্ক যমুনার জলে
                                 ভাসিয়ে দাও
আমি তো নদীর স্বভাব জানি স্রোত বুঝি কূল ভাঙা বুঝি
কিন্তু তোমাকে বুঝতে বাঁশিতে দেখ কতগুলো ছিদ্র
সব ছিদ্র থেকেই ফুঁ বেরোয়
আর আমার বুক থেকে রক্ত।
...